৮ বছর কলেজে উপস্থিত না হয়েও বেতন”প্রতিবাদ করায় পেটালো শিক্ষার্থীদের এমপির এপিএস;

প্রকাশিত: ৪:২৬ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২০

ইলিয়াস আহমেদ:
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ সরকারী কলেজের শিক্ষক তোফায়েল আহমেদ ৮ বছর কলেজে না এসেও ঢাকায় বসে বেতন ভাতা তুলছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষক
তোফায়েল আহমেদ মোহনগঞ্জ সরকারী কলেজের শিক্ষক হিসাবে চাকরী করতেন। তিনি নেত্রকোনা-৪ মোহনগঞ্জ, মদন, খালিয়াজুড়ি এমপির এপিএস বলে জানা গেছে।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের বরাতে জানা যায়, গত ২৮ জানুয়ারী এপিএস তোফায়েল আহমেদ মোহনগঞ্জ সরকারী কলেজ থেকে বিদায়ী সংবর্ধনা দেয়ার কথা ছিল। পরে শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, তিনি গত ৮ বছর যাবত কলেজে আসে না। তাকে কেন বিদায়ী সংবর্ধনা দেয়া হবে। এর প্রেক্ষিতে ২৭ জানুয়ারী কলেজের শিক্ষার্থীরা তোফায়েল আহমেদকে সংবর্ধনা না দেয়ার জন্য মানববন্ধনে করেন। শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করার সময় তোফায়েল আহমেদ সন্ত্রাসী বাহিনী শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালায়। হামলায় দুই শিক্ষার্থী আহত হন।

ওই হামলার পর ২৮ জানুয়ারী স্থানীয় সংবাদ কর্মীরা জানতে পেরে ২৯ জানুয়ারী বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে “৮ বছর কলেজে না এসে বেতন তুলছেন এমপির এপিএস” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে মানববন্ধনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা জীবন বাচানোর ভয়ে কলেজে আসছে না। তাদেরকে কলেজে না আসার জন্য হুমকি দেয়া হচ্ছে বলেও জানা গেছে।

স্থানীয় বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে আরও জানা যায়, তার কথার বাহিরে কোন কিছু করেন না এমপি রেবেকা মোমেন। এই সুযোগে এপিএস তোফায়েল আহমেদ নিজেকে স্বঘোষিত এমপি বলে দাবি করেন। তার কথা ছাড়া মোহনগঞ্জ-মদন-খালিয়াজুড়ি তিন উপজেলার কোন সাধারণ মানুষ এমপি রেবেকা মোমেন’র সাথে দেখা করতে পারেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এই সুযোগে তোফায়েল আহমেদ যা ইচ্ছা তাই করে যাচ্ছেন। ভয়ে দলীয় কোন নেতা কর্মী তার বিরুদ্ধে মুখ খুলেন না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মোহনগঞ্জ সরকারী কলেজের এক শিক্ষক বলেন, তিনি ঢাকায় বসে থেকে গত ৮ বছর যাবত কলেজে না এসেই বেতন ভাতাসহ কলেজের অন্যান্য সুবিধা ভোগ করছেন। কিন্তু, এমপির এপিএস হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলে না। গত বছরের ১লা অক্টোবরে আনুষ্ঠানিক ভাবে কলেজের শিক্ষকতা চাকরী ছেড়ে দেন। এর পর তাকে ২৮ ফেব্রুয়ারী বিদায়ী সংবর্ধনা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু, কলেজের কিছু শিক্ষার্থী তাকে সংবর্ধনা না দেয়ার জন্য মানববন্ধন করেন। মানববন্ধনে তোফায়েল আহমেদ’র সন্ত্রাসী বাহিনী শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালায়। হামলায় দুই শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়। এর পর থেকে ভয়ে মানববন্ধনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা কলেজে আসা ছেড়ে দিয়েছে।

রেবেকা মোমেন ২০০৯ সালে প্রথম সংসদ সদস্য পদে নির্বাচিত হয়। পরে ২০১২ সালে তোফায়েল আহমেদ রেবেকা মোমেনের ব্যক্তিগত এপিএস হিসাবে নিয়োগ পান। এরপর থেকেই তিনি কলেজে না এসে বেতন ভাতা নেয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে রেবেকা মোমেন সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। নিয়ম অনুযায়ী কোন সংসদ সদস্য সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হলে তার ব্যক্তিগত এপিএস অন্য যে কোন চাকরী অব্যাহতি নিতে হবে। কিন্তু, তোফায়েল আহমেদ কলেজের শিক্ষকতার চাকরী থেকে অব্যাহতি না নিয়ে রেবেকা মোমেনের এপিএস’র হিসাবে নিয়োগ পান। এরপর ২০১৫ সালে কলেজের চাকরী থেকে অব্যাহতি না নিয়ে ২০১৯ সালের ১লা অক্টোবরে চাকরী থেকে অব্যাহতি নেন।

মোহনগঞ্জ সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ আবুল হোসেন চৌধুরীর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তোফায়েল আহমেদ বর্তমানে আমার কলেজে চাকরী করে না। আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না বলে তিনি লাইন কেটে দেন। পরে তাকে একাধিক বার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি।

মোহনগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ও মোহনগঞ্জ উপজেলার আওয়ামীলীগের সভাপতি লতিফুর রহমান রতন বলেন, এটাতো উপর মহলের ব্যাপার এ বিষয়ে আমি কোন কিছু বলতে পারব না। তবে, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে তোফায়েল আহমেদ ৮ বছর কলেজে না গিয়েও বেতন ভাতা তুলার বিষয়টি দেখেছি।

এ বিষয়ে তোফায়েল আহমেদের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে একটি কুচক্রি মহল মিথ্যা গুজব ছড়াচ্ছে। এসব অভিযোগ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। তবে, কলেজের শিক্ষার্থীদের উপর মানববন্ধনে সন্ত্রাসী হামলার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেছেন। এ কথা বলেই মিটিংয়ে আছি বলে তিনি লাইন কেটে দেন। পরে একাধিক বার তাকে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

এ বিষয়ে নেত্রকোনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য রেবেকা মোমেন বলেন, কলেজে না গিয়ে বেতন তুলেছেন কিনা এ বিষয়ে জানতে হলে আপনাকে (প্রতিবেদককে) কলেজে গিয়ে জানতে হবে। এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। মানববন্ধনে কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী মারধর এবং কলেজে না আসার হুমকি দিচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বহিরাগত সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে। আর হুমকির বিষয়ে আমার কিছু জানা নাই। তোফায়েল আহমেদ তো আপনার ব্যক্তিগত এপিএস, তার এমন কার্যকলাপের বিষয়ে আপনার বক্তব্য কি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অন্যায় প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাছাড়া সোমবার (৩ ফেব্রুয়ারী) কলেজে একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। এ বিষয়ে কেউ কোন অভিযোগ করেননি।