ভালুকায় নব্য আওয়ামীগ নেতার ত্রাসের রাজত্ব !

প্রকাশিত: ৫:২৪ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৪, ২০২০

মো: আমান উল্লাহ আকন্দ, ময়মনসিংহ :
জোরপূর্বক জমি দখল, বীরমুক্তিযোদ্ধাকে লাঞ্চিত করা এবং নিজের অনুগত সন্ত্রাসীদের দিয়ে কলেজ শিক্ষককে মারপিট সহ নানান বিতর্কিত কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন নব্য আ’লীগ নেতা আবুল কালাম আজাদ। তিনি বর্তমান ভালুকা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। এনিয়ে স্থানীয়দের মাঝে সমালোচনা থাকলেও ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চায় না।
তবে গত ২০ জানুয়ারী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য কলেজ শিক্ষক হুমায়ন কবীরকে মারপিট করার ঘটনায় আবুল কালাম আজাদকে প্রধান আসামী করে আদালতে মামলা দায়ের হলে প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন ভুক্তভোগী অনেকেই। বেরিয়ে আসছে নব্য এ আওয়ামীলীগ নেতার বিতর্কিত কর্মকান্ডের নানান তথ্য।
যে ভাবে বিএনপি থেকে তিনি হলেন প্রভাবশালী আওয়ামীলীগ নেতা: আবুল কালাম আজাদ ছাত্রজীবন থেকেই বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। ১৯৯০ সালে তিনি ১০নং হবিরবাড়ী ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ওই ইউনিয়নে যুবদলের কমিটিতে সহ-সাধারন সম্পাদক পদ পান। এরপর ২০০৩সালের ৩১শে জুলাই উপজেলা বিএনপির তৎকালীন আহবায়ক অ্যাড. আনোয়ারুল আজিজ টুটুল স্বাক্ষরিত ইউনিয়ন বিএনপির কমিটিতে তিনি সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক নির্বাচিত হয়ে উপজেলা বিএনপির সদস্য হন। তবে আওয়ামীলীগ সরকার প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর আবুল কালাম আজাদ দল বদল করে আ’লীগের যোগদান করেন এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর স্ত্রীর বড় ভাই কাজীমুদ্দিন আহম্মেদ ধনু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে উপজেলা কৃষক লীগের সহ-সভাপতি পদ পান তিনি। এরপর আ’লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে আনারস প্রতিকে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান বিজয়ী হয়ে তিনি এখন প্রভাবশালী আ’লীগ নেতা।
বীরমুক্তিযোদ্ধাকে লাঞ্চিত ও কলেজ শিক্ষককে মারপিটের অভিযোগ : ৮নং ডাকাতিয়া ইউনিয়নের বীরমুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক তালুকদার অভিযোগ করেন, বিগত ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানের ব্যনারে উপজেলা চেয়ারম্যানের ছবি না দেওয়ায় অনুষ্ঠান স্থলেই আমাকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করেন তিনি। তিনি বলেন, আমি দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি। অপরদিকে তাঁর পিতা মৃত খালেক মাষ্টার ছিল শান্তি কমিটির সদস্য। বিষয়টি মেনে নিতে না পেরে ফেইসবুকে পোষ্ট করেছিল। ওই পোষ্ট শেয়ার করায় চেয়ারম্যানের লোকজন এক কলেজ শিক্ষককে মারধর করেছে।
কলেজ শিক্ষক হুমায়ন কবীর জানান, বীরমুক্তিযোদ্ধা পোষ্ট শেয়ার করায় চেয়ারম্যানের ক্যাডাররা আমাকে মারধর করে ডান কান নষ্ট করে দিয়েছে। এ ঘটনায় মামলায় করায় এখন তিনি আমাকে জানে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছেন।
সমালোচনাকারীদের হুমকি: উপজেলার ডাকাতিয়া ইউনিয়ন কৃষকলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হাসেম আহম্মেদ ও একই এলাকার ছিটালপাড়া গ্রামের শাহ আলম জানান, উপজেলা চেয়ারম্যানের বিতর্কিত কর্মকান্ডের সমালোচনা করে ফেইসবুকে পোষ্ট করায় তিনি এবং তাঁর ক্যাডাররা আমাদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছে।
শাহ আলম আরো জানান, গত ৬ জানুয়ারী ডাকাতিয়া ইউনিয়নের জনাব আলী সিকদারের বাড়ীতে একটি বাউল গানের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা চেয়ারম্যান হুমকি দিয়ে বলেছেন ‘যারা আমার সমালোচনা করেন তারা এলাকা ছেড়ে ভালুকা বাসস্ট্যান্ডে আসেন, দেখি কার নাক কতক্ষন মুখে থাকে।’
চেয়ারম্যান ও তাঁর ছোট ভাইয়ের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ : অভিযোগ উঠেছে, গত ১৬ জানুয়ারী আবুল কালাম আজাদের ছোট ভাই আবুল কাশেমের নেতৃত্বে ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীরা মৃত রমজান আলী ডিলারের স্ত্রীকে মারধর করে সিডস্টোর উত্তর বাজার সংলগ্ন ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে ১৬ শতাংশ জমি জবর দখল করে মাটি ভরাট করেছেন।
মৃত রমজান আলীর ছেলে কামরুল ইসলাম অভিযোগ করে জানান, ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে চেয়ারম্যানের ভাই কাশেম আমাদের জমিতে সন্ত্রাসী তান্ডব চালিয়ে মাটি ভরাট করেছে। বাধা দিলে তারা আমার মাকে মারধর করে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আবুল কাশেম বলেন, মাটি ভরাট হচ্ছে আমার ব্যবসা। মহিউদ্দিন বলেছে তার জমিতে মাটি ভরাট করে দিতে, তাই আমি করে দিয়েছি। আমি কারো জমি দখল করিনি।
৮ নং হবিরবাড়ী ওয়ার্ড আ’লীগের সভাপতি আবুল হাসেম অভিযোগ করেন, বিগত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আমি নৌকার পক্ষে নির্বাচন করেছিলাম। কিন্তু বিদ্রোহী প্রার্থীতায় আবুল কালাম আজাদ চেয়ারম্যান হবার পর ৭ শতাংশ জমিসহ আমার বাড়ী দখল করে নিয়েছে। ওই বাড়ীতে এখন তাঁর কর্মী বাবুল বসবাস করে। এ ঘটনায় প্রশাসনের সহযোগীতা না পেয়ে উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদকের মাধ্যমে আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছি।
স্থানীয় আওলাতলী খাইরুন্নেচ্ছা বিবি ওয়াকফা ষ্ট্রেটের মোত্ত্বয়াল্লী খন্দকার আসাদুজ্জামানের অভিযোগ, আবুল কালাম আজাদ ও তাঁর স্ত্রী পাপড়াগাঁও মৌজায় ভুয়া দলিল করে ষ্ট্রাটের সাড়ে তিন একর জমি দখল করে নিয়েছে। এ ঘটনায় জেলা আদালতে মামলা চলছে। মামলা নং-২৫/১৭।
আওয়ামীলীগ নেতাদের ভাষ্য: ১০নং হবির বাড়ী ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি নিজাম উদ্দিন বলেন, চেয়ারম্যান ও তাঁর ভাইয়ের জমি দখলের অভিযোগ শুনেছি। সত্য-মিথ্যা জানি না। তবে আবুল কালাম আজাদ হবিবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদে ৩ বার চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে পরাজিত হন। কিন্তু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর বড় ভাই কাজীমুদ্দিন আহম্মেদ ধনু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবার পর তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছে। এখন তাঁর বিতর্কিত কর্মকান্ডে আওয়ামীলীগের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে।
উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বলেন, উপজেলা চেয়ারম্যান ময়মনসিংহ-১১ আসনের সংসদ সদস্য কাজীমুদ্দিন আহম্মেদ ধনুর বোন জামাই। আগে বিএনপি করলেও এখন তিনি বড় আ’লীগ নেতা। তাঁর বিতর্কিত কর্মকান্ডে দলের ভাবমূর্তি ব্যাপক ভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে।
অভিযোগ বিষয়ে ভালুকা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের বক্তব্য:
ভালুকা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমি বিএনপি করতাম এটা সত্য। ৯০’এ আমি ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি ছিলাম, যুবদল করেছি। তবে ২০০৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমি আনুষ্ঠানিক ভাবে আ’লীগে যোগদান করেছি। বর্তমানে আমি উপজেলা কৃষক লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি। জমি দখলের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জমি দখলের অভিযোগ বানোয়াট। যে দাগে আমার জমি সেই দাগে ওয়াকফা ষ্ট্রেটের কোন জমি নেই। তাছাড়া কামরুলের জমি আমার ভাই দখল করেনি। আর যাদের হুমকি দিয়েছি বলে অভিযোগ করেছে, আমি তাদের চিনি না।