জার্নাল ডেস্ক
22 December 2019
  • No Comments

    অবৈধ সংযোগে ময়মনসিংহ তিতাস গ্যাসে হরিলুট !

    আমান উল্লাহ আকন্দ,ময়মনসিংহ:
    ময়মনসিংহ তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিষ্ট্রিবিউশন আঞ্চলিক কার্যালয়ের অবৈধ সংযোগে সরকারী সম্পদ হরিলুটের মহোৎসব চলছে। অভিযোগ উঠেছে, আবাসিক সংযোগের পাশাপাশি বাণিজ্যিক সংযোগেও চুরি হচ্ছে গ্যাস। ফলে সরকারী সম্পদ হরিলুট করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট একটি সিন্ডিকেট। আর এসবের নেপথ্যে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত রয়েছেন খোদ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
    জানা যায়, ময়মনসিংহ নগরীর লিচু বাগান এলাকার বাসিন্দা হাজী আ: রহমান(৬৫) তিতাস গ্যাসের একজন বৈধ গ্রাহক। কিন্তু তাঁর অজান্তেই প্রতিবেশী এক প্রবাসী তাঁর বৈধ গ্যাস সংযোগ থেকে মাটির নিচে লাইন কেটে অবৈধ সংযোগ লাগিয়ে বিশাল ভবনে প্রায় ৮ থেকে ১০টি চুলা ব্যবহার করে আসছেন র্দীঘদিন ধরে। সম্প্রতি নগর কর্তৃপক্ষ ড্রেন নির্মানে খুড়াখুড়ি শুরু করলে বিষয়টি টের পান হাজী আ: রহমান। তিনি জানান, আমার সংযোগ থেকে কখন চুরি করে অবৈধ সংযোগ লাগানো হয়েছে, তা আমি অবগত নই। শুনেছি একই ভাবে এলাকায় আরো অসংখ্য অবৈধ সংযোগে গ্যাস হরিলুট হচ্ছে। এর সাথে অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদাররা জড়িত।
    তিতাস সূত্র জানায়, ময়মনসিংহ তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিষ্ট্রিবিউশন আঞ্চলিক কার্যালয়ের অধীনে আবাসিক বৈধ গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৫৮ হাজার একশত ৫৭জন। শিল্প সংযোগ রয়েছে ৮৬টি। এর মধ্যে ময়মনসিংহে আবাসিক গ্রাহক রয়েছে প্রায় ২৫ হাজার, বাণিজ্যিক সংযোগ রয়েছে ১৫৫টি এবং শিল্প সংযোগ রয়েছে ১২টি। তবে উপদেষ্টা কমিটির সুপারিশে আরো ১৫টি শিল্প সংযোগ প্রক্রিয়াধীন আছে বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহ তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিষ্ট্রিবিউশন আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো: নজরুল ইসলাম।
    একাধিক সূত্রের দাবি, নগরীর ভাটি কাশর গোরস্থান সংলগ্ন হাফিজ, সিরাজ, দেলুসহ অসংখ্য ব্যক্তির পরিবারে বছরের পর বছর ধরে চলছে তিতাস গ্যাসের অবৈধ সংযোগ। নগরীর কাচিঝুলি মসজিদ রোড ও ইটাখলা রোড এলাকার জৈনক এক সরকারী কর্মচারীসহ বেশ কয়েক জনের বাসায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে বলেও দাবি সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের।
    নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা বলেন, সানকিপাড়া এস.এ সরকার রোড এলাকায় ২০১৬ সালের শেষ দিকে জমি কিনে বহুতল ভবন নির্মান করেছেন জৈনক এক ব্যাক্তি। এর আগেই গ্যাসের নতুন আবাসিক সংযোগ বন্ধ ঘোষনা করে দেয় সরকার। কিন্তু রহস্যজনক ভাবে ওই ভবনে ব্যবহার হচ্ছে গ্যাসের সংযোগ। এমন নজির নগরীতে অহরহ বলেও দাবি ওই সূত্রের।
    অবৈধ সংযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট অফিসের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো: শাহজাদা ফরাজী। তিনি বলেন, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযান চলছে। গত কয়েকদিন আগে নগরীর ভাটিকাশর এলাকার একটি অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে মামলা দেয়া হয়েছে। এছাড়াও গত জুলাই মাসে ২৩টি অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। একই ভাবে বকেয়া বিলের জন্য আরো ১৬টি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
    সংশ্লিষ্ট তিতাস কর্মকর্তারা জানান, ‘২০১৫সাল থেকে সরকারী ভাবে তিতাস গ্যাসের আবাসিক সংযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর থেকে শিল্প সংযোগ চালু থাকলেও বন্ধ রয়েছে ময়মনসিংহে গ্যাসের আবাসিক সংযোগ।’ কিন্তু আইনত অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে ময়মনসিংহে এখনো গ্যাসের আবাসিক সংযোগ চলছে গোপন সিন্ডিকেটে। সচেতন মহলের ভাষ্য, কোন ব্যক্তি চুরি করে গ্যাস সংযোগ নিলেও ওই সংযোগের রাইজার আসে কোথা থেকে ? তাদের দাবি, অফিস কর্তা ম্যানেজ ছাড়া রাইজার পাওয়া অসম্ভব কাজ।
    ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের ২৫নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মনোয়ার হোসেন বিপ্লব অভিযোগ করে বলেন, অনিয়মের মধ্য দিয়েই চলছে ময়মনসিংহ গ্যাস অফিস। সপ্তাহে মাত্র দুই দিন কর্মকর্তারা অফিসে আসেন। অন্য দিনগুলোতে তাদের পাওয়া যায় না। তিনি জানান, সম্প্রতি কোন ধরনের নোটিশ না দিয়েই মাসকান্দাস্থ একটি মিষ্টির দোকানের বৈধ সংযোগ অতিরিক্ত গ্যাস পুড়ার অভিযোগে কেটে দিয়েছে অফিসের লোকজন। অথচ ওই গ্রাহক নিয়মিত ১২ ইউনিটের বিল পরিশোধ করছেন। কিন্তু একই ধরনের বাণিজ্যিক সংযোগ যেমন- ধানসিঁড়ি রেষ্টেুরেন্ট, মিষ্টি কানন, রিফাত হোটেল, সারিন্দা রেষ্টুরেন্ট, কৃঞ্চাকেবিন, দয়াময় মিষ্টান্ন ভান্ডারে অতিরিক্ত গ্যাস পুড়ানো হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তিনি দাবি করেন, মূলত গিভ এন্ড টেইকের মাধ্যমেই সব হয় তিতাস অফিসে।
    জানা যায়, সংশ্লিষ্ট অফিসের সহকারী হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা মো: মমিনুল ইসলাম রাইজার অনুমোদনের দ্বায়িত্ব পালন করে থাকেন। তবে এবিষয়ে জানতে চাইলে মমিনুল ইসলাম বলেন, অবৈধ সংযোগকারীরা রাইজার কোথায় থেকে পায়, তা আমার জানা নেই। অভিযোগ রয়েছে, নগরীর লিচুবাজান এলাকা থেকে এক ব্যাক্তির কাছ থেকে আবাসিক সংযোগ দেবার কথা বলে টাকা নিয়েছেন ওই কর্তা। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমি কারো কাছ থেকে টাকা নেইনি। বিষয়টি আমি অবগত নই।’
    ভূক্তভোগী সূত্র জানায়, ডা: ইমরুল হাসান, সুফিয়া নেওয়াজসহ মোট ৫জন ব্যক্তি বিগত ৭মাস আগে মালিকানা পরিবর্তনের জন্য লিখিত আবেদন করেছেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে এখন পর্যন্ত ফাইল ছাড়ছেন না প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো: শাহজাদা ফরাজী।
    তবে ব্যবস্থাপক শাহজাদা ফরাজী দাবি করেন, একটি বার্নার অনুমোদনের বেশি থাকায় মালেক চেয়ারম্যানের বাণিজ্যিক সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। বর্তমানে তা সংশোধন করে পুনরায় সংযোগের জন্য ফাইল প্রক্রিয়াধীন আছে। কিন্তু মালিকানা বদলের কোন ফাইল আমার কাছে পেন্ডিং আছে বলে জানা নেই। অন্যদের কাছে থাকতে পারে। তবে সম্প্রতি প্রধান কার্যালয়ে কাজ থাকায় আমি কিছুদিন অফিসে অনিয়মিত থাকলেও এখন নিয়মিত অফিসে আছি।
    জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের উপ-মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো: নজরুল ইসলাম বলেন, সরকারী ভাবে গ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে। তবে বর্তমানে প্রায় অর্ধলক্ষাধিক আবাসিক সংযোগের চাহিদা রয়েছে। সরকারী অনুমনি পেলে নতুন সংযোগ নিয়ে কাজ করা হবে। তবে অবৈধ সংযোগ বিষয়ে কোন তথ্য আমার জানা নেই।
    এসব বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো: মসিহুর রহমান বলেন, আমি একটি মিটিংয়ে আছি। এসব বিষয়ে পরে কথা বলব।

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *