জার্নাল ডেস্ক
1 July 2021
  • No Comments

    বিনায় যত অনিয়ম ! নেপথ্যে মহাপরিচালকের ক্ষমতার অপব্যবহার

    নিজস্ব প্রতিবেদক:

    নানা অনিয়মে চলছে বাংলাদেশ পরামাণু কৃষি গবেষনা ইন্সটিটিউট (বিনা)। এসবের নেপথ্যে রয়েছে খোদ প্রতিষ্ঠান প্রধানের ক্ষমতার অপব্যবহার। এনিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়সহ প্রতিষ্ঠানের ভেতরে-বাইরে মিশ্রপ্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
    অভিযোগ উঠেছে, প্রতিষ্টানটির আউটসোর্সিয়ে ৩৫ জন জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় খোদ ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলামের অন্যায় ও অবৈধ হস্থক্ষেপের ঘটনায় কৃষি মন্ত্রনালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী গ্লোবাল ফার্স্ট সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী হাওলাদার। এ ঘটনায় তিনি মহামান্য হাইকোর্টে ইতিমধ্যে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেছেন বলেও নিশ্চিত করেছেন তিনি।
    আউটসোর্সিয়ে ৩৫ জন জনবল নিয়োগে মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে অন্যায় ও অবৈধ হস্থক্ষেপ অভিযোগ :
    ওই অভিযোগে মোহাম্মদ আলী হাওলাদার জানান, ‘বিনার আউটসোর্সিয়ে ৩৫ জন জনবল নিয়োগের জন্য বিগত বছরের ১৭ ডিসেম্বর কার্যাদেশ গ্রহন করে নিয়োগের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারী চূড়ান্ত তালিকা প্রেরণ করি। কিন্তু মহাপরিচালক তা গ্রহন না করে তাদের সাজানো অনৈতিক উপায়ে সংগ্রহ করা একটি তালিকা আমাকে দিয়ে অনুমোদনের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। এ সময় মহাপরিচালকের রুমে বিনার বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সহিদুল ইসলাম ও ড. কামরুজ্জামান জোরপূর্বক তাদের দেওয়া তালিকায় স্বাক্ষর নেয়ার অপচেষ্টা করে। এতে আমার প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে এবং আমি আর্থিক ক্ষতি ও হয়রানির শিকার হচ্ছি।’
    তবে এবিষয়ে ভিন্ন দাবি করেছেন বিনার পরিচালক প্রশাসন (সার্পোট ও সার্ভিস) ড. আবুল কালাম আজাদ। তিনি জানান, সময় মত কার্যাদেশ বাস্তবায়ন করতে না পারায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফার্স্ট সার্ভিসেস লিমিটেডের সাথে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। এ ঘটনায় উচ্চ আদালতে কোন রিট পিটিশন দায়ের হয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই।
    এক ব্যক্তি দুই প্রকল্পের পিডি :
    অভিযোগ উঠেছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অমান্য করে বিনা মহাপরিচালক ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের আস্থাভাজন এক ব্যক্তিকে দুটি প্রকল্পের পিডি করে রেখেছেন। অথচ ‘একজন কর্মকর্তা একাধিক প্রকল্পের পরিচালক’ বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী ‘ভয়াবহ’ উল্লেখ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য চলতি বছরের ২০ জানুয়ারী প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এক চিঠিতে আদেশ জারী করা হয়। কিন্তু ওই আদেশের পরও পরমানু কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউটের দু’টি প্রকল্পে ড. শহীদুল ইসলাম প্রকল্প পরিচালক হিসেবে বহাল তবিয়তে দ্বায়িত্ব পালন করছেন। প্রকল্প দু’টি হল- জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড এবং চর হাওড় উত্তর অঞ্চল পাহাড়ী প্রকল্প।
    এবিষয়ে বিনার পরিচালক (প্রশিক্ষণ) ড. জাহাঙ্গীর আলম জানান, প্রকল্প এবং কর্মসূচীর মধ্যে পার্থক্য থাকলেও এক ব্যক্তি দু’টি প্রকল্পের পরিচালক বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর চিঠির পর বিষয়টি নিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান ভাবতে শুরু করেছে। আমরাও বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছি।
    এসআরএসডি প্রকল্পে যন্ত্রাংশ ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগ:
    সংশ্লিষ্ট সূত্রে অভিযোগ রয়েছে, বিনার বিগত এসআরএসডি প্রকল্পে ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম গবেষনা কাজের জন্য সরকারের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা বরাদ্ধ নিয়ে নিন্মমানের যন্ত্রপাতি ক্রয় করেন। যা ব্যবহার করার আগেই অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ফলে বছরের পর বছর ওই সকল যন্ত্রপাতি স্টোর রুমে ফেলে রেখে নষ্ট করা হয়েছে। এতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে।
    তবে এবিষয়ে বিনার পরিচালক প্রশাসন (সার্পোট ও সার্ভিস) ড. আবুল কালাম আজাদ জানান, এসআরএসডি প্রকল্পের যন্ত্রপাতি অনুপযোগী কি না, তা কমিটির মাধ্যমে খতিয়ে দেখে ওয়াকসনে নেয়া হবে। এর বাইরে আমার কিছু জানা নেই।
    ভারপ্রাপ্ত মানতে নারাজ :
    বর্তমান মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র। তাদের ভাষ্যমতে, কৃষি মন্ত্রনালয় ২০২০ সালের ১৯ মার্চ এক অফিস আদেশে বিনার মহাপরিচালক পদে মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলামকে মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) পদে নিয়োগ দেন। কিন্তু দ্বায়িত্ব পেয়ে ড.মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম ‘ভারপ্রাপ্ত’ মানতে নারাজ। আর এ কারণেই তিনি তাঁর কক্ষের নেইমপ্লেটে ‘ভারপ্রাপ্ত’ শব্দটি উপেক্ষা করেছেন। কেউ তাঁর পদ ভারপ্রাপ্ত বললে বা লিখলে তিনি ক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন।
    ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগ :
    গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর এক আদেশে বিনার ৩৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলির আদেশ দেওয়ায় বিনার বিজ্ঞানী সমিতি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে মিশ্রপ্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এতে ক্ষুব্ধ বিজ্ঞানী সমিতি চলতি বছরের ৩ জানুয়ারী এক জুরুরী সভায় বদলির আদেশে অসঙ্গতি উল্লেখ করে আদেশ পুর্নবিবেচনার জন্য ৮ দফা দাবি জানিয়ে রেজুলেশন পাশ করেন। ওই রেজুলেশনে তুচ্ছ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র-জুনিয়র বিজ্ঞানীদের সাথে উর্ধ্বতন কর্মকর্তার অশোভন আচরণসহ কারণ দর্শানোর বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ১৯৯৪ সালে ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম বিনায় নিয়োগ লাভ করে তাঁর বাড়ী টাঙ্গাইল হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের ৬ জন সিনিয়রকে ডিঙ্গিয়ে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক পদ ভাগিয়ে নিয়েছেন।
    চাকরিচুত্যের অভিযোগ :
    ভুক্তভোগী বিনার চাকরিচুত্য কর্মচারী শিবলী সাদিক জানান, টানা ১৭ বছর দৈনিক মুজুরী ভিত্তিতে ড্রাইভার পদে কর্মরত থাকার পর তুচ্ছ ঘটনায় আমিসহ ৩ জন ড্রাইভারকে মহাপরিচালক প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে চাকরিচুত্য করেছেন। এতে আমরা পরিবার নিয়ে অসহায় জীবন-যাপন করছি।
    নেপথ্যে বিজ্ঞানী সমিতির নির্বাচনে পরাজয়ের ক্ষোভ :
    ভুক্তভোগী একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, ২০১৯ সালের ৩ অক্টোবর বর্তমান মহাপরিচালক বিনার বিজ্ঞানী সমিতির নির্বাচনে সভাপতি পদে এবং তাঁর সহধর্মীনি শামসুন্নাহার বেগম যুগ্ম সম্পাদক পদে নির্বাচন করেছিলেন। ওই নির্বাচনে তারা বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হন। মূলত ওই ক্ষোভের কারণেই সময় সুযোগে নানা ইস্যুতে তিনি প্রতিপক্ষের ভোটারদের উপর ক্ষোভ ঝাড়ছেন বলেও অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
    মহাপরিচালকের বক্তব্য :
    তবে এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালক মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বদলির বিষয়ে ইনটেনশনালি কারো কারো অভিযোগ থাকতে পারে। তবে বদলির আদেশে কোন ক্ষোভ বা অনিয়ম নেই। এছাড়াও নিয়ম মেনেই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় কয়েক জন ড্রাইভারকে চাকরী থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। এতেও কোন অনিয়ম নেই।’ তবে আউটসোর্সিয়ে ৩৫ জন জনবল নিয়োগে অন্যায় ও অবৈধ হস্থক্ষেপ অভিযোগ বিষয়ে জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি কোন ধরনের মন্তব্য করতে অপরাগতা প্রকাশ করেন।

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *