জার্নাল ডেস্ক
25 February 2021
  • No Comments

    ময়মনসিংহে কর্মসৃজন প্রকল্পে  শ্রমিকের অধিকার নিয়ে নয় ছয়!

    নিজস্ব প্রতিবেদক:

    ময়মনসিংহে কর্মসৃজন প্রকল্পে শ্রমিকের অধিকার নিয়ে নয় ছয় ও  টাকা লুটপাট করার জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা ভেকু মেশিন ব্যবহারসহ তাদের অনুসারীদের শ্রমিক বানিয়ে প্রকল্পের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার  অভিযোগ উঠেছে। এনিয়ে ভুক্তভোগী মহলে মিশ্রপ্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

    সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারের ত্রাণ ও দূর্যোগ মন্ত্রনালয়ের ২০২০-২০২১ অর্থ বছরের অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি প্রকল্পে মফস্বলের কর্মহীন প্রান্তিক শ্রমজীবি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার ৪০ দিনের জন্য কর্মসৃজন প্রকল্প চালু করে। নিয়ম অনুযায়ী এ প্রকল্পের কাজ শুরু করার আগে এলাকা ঘুরে শ্রমিক তালিকা তৈরীর নির্দেশনা রয়েছে। পরে ওই তালিকা যাচাই-বাছাঁই করে চূড়ান্ত হলে কাজ শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইব সাইট এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের নোটিশ বোর্ডে প্রকল্পের নাম ও শ্রমিক তালিকা টানানোর বিধান রয়েছে। কিন্তু ময়মনসিংহের জেলার ১৩টি উপজেলার ১৪৭টি ইউনিয়নের কোন উপজেলা বা ইউনিয়নে এসব নিয়ম মানা হচ্ছে না। সরকার এ প্রকল্পের লুটপাট ঠেকানোর জন্য বেশ কয়েকটি সরকারী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রতিজন শ্রমিকের বিপরিতে ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে টাকা উত্তোলনের নির্দেশনাও রয়েছে। অর্ধশত কোটি টাকা বরাদ্ধে জেলার এ প্রকল্পে শ্রমিকরা উপকারভোগী হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে হচ্ছে তার উল্টো। বাস্তবে জেলার সদর,নান্দাইল, তারাকান্দা, ফুলবাড়ীয়া, মুক্তাগাছাসহ সব’কটি উপজেলায় অতিদরিদ্রদের কর্মসৃজন প্রকল্পে শ্রমিকের বদলে কাজ হয়েছে ভেকু মেশিনে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা এসব নিয়ম না মেনে সিন্ডিকেট গড়ে তোলে শ্রমিকদের তালিকা ব্যবহার করে ওই শ্রমিকদের দিয়ে ব্যাংক হতে টাকা উত্তোলন করে তাদের নামমাত্র বখশিশ দিয়ে এই টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

    ভুক্তভোগী শ্রমিকদের অভিযোগ, আমাদের কাজ কেড়ে নিয়ে ভেকু মেশিন দিয়ে কাজ করছে চেয়ারম্যান-মেম্বার।আমাদের পরিবার চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
    সূত্রমতে, ময়মনসিংহ জেলায় ২০২০-২১ অর্থ বছরে প্রথম পর্যায়ে ১৩টি উপজেলায় মোট উপকারভোগীর সংখ্যা ৫৯ হাজার ৭৪১জন। এসব শ্রমিকের বিপরিতে মোট অর্থ বরাদ্ধের পরিমান ওয়েজ-ননওয়েজ ও সরদার মিলিয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকার অধিক বরাদ্ধ পায়।
    জানা যায়, এ প্রকল্পের জেলার সভাপতি হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন জেলা প্রশাসক এবং সদস্য সচিব হিসেবে থাকেন জেলার ত্রান ও পর্নবাসন কর্মকর্তা। উপজেলা পর্যায়ে এ প্রকল্পের সভাপতি হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সদস্য সচিব হিসেবে থাকেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তারা। পরবর্তী পর্যায়ে ইউপি চেয়ারম্যান, সচিব ও মেম্বারগণ এ প্রকল্পের দ্বায়িত্ব পালন করেন। তবে প্রকৃত শ্রমিক দিয়ে এসব প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের নির্দেশনা থাকলেও বর্তমানে ময়মনসিংহ জেলার বেশ কিছু ইউনিয়নে নামমাত্র কাজ হয়েছে ভেকু মেশিনে।
    অভিযোগ রয়েছে, ২০২০-২০২১ অর্থবছরে প্রথম পর্যায়ে ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে ৯৭টি প্রকল্পে ৪৯৬৫জন শ্রমিকের বিপরীতে মোট ৩ কোটি ৯৭ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ হলেও বাস্তবে গত ৮ জানুয়ারি থেকে ১২ই জানুয়ারি বিভিন্ন প্রকল্প ঘুরে দেখা গেছে ভেকু মেশিনে কাজ হচ্ছে । উপজেলার মুশুল্লী, রাজগাতিসহ বেশ কটি ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডে দেখা গেছে এ চিত্র। এতে প্রতি ঘন্টায় দুই হাজার টাকা ভাড়া নিচ্ছেন ভেকু মালিক।
    ভেকু মেশিনের কাজের সত্যতা স্বীকার করেছেন নান্দাইলের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এরশাদ উদ্দিন। তিনি বলেন অনিয়মের বিষয়টি জানতে পেরে ভেকু মেশিনে কাজ বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছিলাম।
    এছাড়া তারাকান্দা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জাকারিয়া উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে  প্রকল্পের আওতায় ৪ হাজার ৮০৪৪ জন তালিকাভুক্ত শ্রমিকের তালিকায় প্রকল্পের কাজ শেষ দেখিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি উপজেলার ডাকুয়া,বালিখা,তারাকান্দা সদর,জালা গাও,কাকানি,বিশকা,কামারিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডে শ্রমিকের বদলে কাজ করিয়েছেন ভেকু মেশিনে। প্রকল্পে ভেকু মেশিনের সত্যতা স্বীকার করেছেন তারাকান্দার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জাকারিয়া। তিনি বলেন, লেবার কত টাকা পেয়েছে বা না পেয়েছে, সেটা ব্যাংকের বিষয়। আমাদের কয়েকটা প্রকল্পে খাল থাকায় ভেকু মেশিন দিয়ে কাজ করিয়েছি।
    এ ব্যপারে তারাকান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার জান্নাতুল ফেরদৈাস বলেন,তিনি বালিখা ইউনিয়নের দুটি প্রকল্পে পরিদর্শন করেছেন কোথাও ভেকু মেশিন ব্যবহার দেখতে পায়নি। পিআইও ভেকু মেশিনের কথা স্বীকার করলে সেটা তার বক্তব্য।
    অপরদিকে অভিযোগ উঠেছে-ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরনিলক্ষীয়া ইউনিয়নে প্রকল্পে ৫৯৪ জন শ্রমিক তালিকাতে দেখালেও, সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পুরো ইউনিয়নে কাজ করেছেন মাত্র ২২৭ জন শ্রমিক। প্রকল্পের কার্যদিবস শেষ হলেও উপজেলার কোথাও প্রকল্পের কোন সাইনবোর্ড লক্ষ্য করা যায়নি। প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করতেই সেই সাইনবোর্ড ব্যবহার করা হয়নি বলে অভিযোগ অনেকের।
    চরনীলক্ষিয়া ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম  বলেন, প্রকল্পের কোন শ্রমিকের কাজের টাকা না পেয়ে থাকলে তা ব্যাংক ও প্রকল্পের সভাপতির দায়ভার। অনিয়মের  অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
    ময়মসিংহ সদরের  প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হাশেম রেজা বলেন, আমি এখন ব্যস্ত আছি। অফিসে আসেন, সাক্ষাতে কথা হবে।
    ময়মনসিংহ সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, আরো ভালো করে তদন্ত করেন। অভিযোগ প্রমানিত হলে  প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
    একই চিত্র জেলার ফুলবাড়ীয়া উপজেলার বাক্তা, নাওগাঁও, পুটিজানা, এনায়েরপুর, কুশমাইলসহ সবকটি ইউনিয়নে।এসব প্রকল্পেও ভেকু মেশিনে ব্যবহার হয়েছে।
    ময়মনসিংহ জেলা ত্রান ও পর্নবাসন কর্মকর্তা  সানোয়ার হোসেন অভিযোগ খন্ডন করে বলেন, ময়মনসিংহ জেলার কোথাও প্রকল্পের অনিয়ম চোখে পড়েনি।তবে কয়েক স্থানে মৈখিক অভিযোগ পেয়েছিলাম সরেজমিনে গিয়ে তা প্রমাণিত হয়নি। ভেকু মেশিনে কাজ করার কোন সুযোগ নেই।
    জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান বলেন,  শ্রমিকদের কেউ  সুস্পষ্ট অভিযোগ  দিলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। একজন ব্যাক্তি আমাকে এ ব্যাপারে মৈখিক জানিয়েছেন । অনিয়মের ব্যাপারে কোন ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানান।

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *