জার্নাল ডেস্ক
18 June 2020
  • No Comments

    কামরুল ইসলাম ওয়ালিদ : একজন নন্দিত জননেতার অকাল প্রস্থান

    কামরুল ইসলাম মো: ওয়ালিদ। একজন নন্দিত জননেতার নাম। উনবিংশ শতাব্দির শেষাংশে ময়মনসিংহের রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি ছিলেন স্টাইলিষ্ট রাজনীতির মডেল। চলন বলন আর পোষাক পরিচ্ছেদে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অনুকরণে তিনি ছিলেন একজন বিএনপি পাগল মানুষ। সদা-সর্বদা রাজনৈতিক ও সামাজিক বিচরণে জিয়া সানগ্লাস ছিল তাঁর প্রিয় ফ্যাশনের অন্যতম এক উপকরণ। দল আর দলীয় নেতা-কর্মীদের সাথে তাঁর ছিল অকৃত্রিম হৃদ্ধ্যতা। শুধু তাই নয়, দলীয় পরিমন্ডলের বাইরেও তিনি ছিলেন সম্প্রীতি বান্ধব একজন অনন্য মানুষ। ফলে সকল রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের সাথে তাঁর ছিল দৃশ্যমান সখ্যতা। যদিও এনিয়ে গুঞ্জণ ছিল তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মহলে। তবে তিনি ছিলেন একজন উদারমনা ব্যতিক্রমী এক রাজনীতিক।


    ছাত্র জীবন থেকে ওয়ালিদ ছিলেন অসম্ভব বন্ধু বৎসল একজন মানুষ। ১৯৮৭সালে নিজের হুড খোলা উইলিস জিপে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডারত ওয়ালিদ, ফিরোজ, তমাল, রেজা, প্রবীর, শফিক, সজল, ভুলন, বাবলু, পল্টু, মিল্টনের ছবিটি তাই প্রমান করে।

    সময়টা ১৯৮০-৮১ সাল। স্কুলের ছাত্র থাকাকালীন সময়েই জাসদ ছাত্রলীগের একজন কর্মী হিসেবে কামরুল ইসলাম মো: ওয়ালিদের রাজনৈতিক জীবনের পথচলা শুরু। অত:পর ১৯৮৬-৮৭ সালের দিকে তৎকালীন জেলা ছাত্রদলের বিপ্লবী সভাপতি জননেতা আবু ওয়াহাব আকন্দের হাত ধরে নাসিরাবাদ কলেজ ছাত্রদলের এক সম্মেলনে অনুষ্ঠানিক ভাবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে যোগদান করেন তিনি। ছাত্র রাজনীতিতে তখন তাঁর কোন দলীয় পদ-পদবি না থাকলেও তিনি ছিলেন এক জনপ্রিয় ছাত্রনেতা। ফলে ১৯৮৯ সালে নাসিরাবাদ কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচনে প্রথম বারের মত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল মনোনীত ওয়ালিদ-ফরহাদ প্যানেলে ভিপি পদে ব্যাপক জনপ্রিয়তায় জয় লাভ করেন। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে দ্বিতীয় বার ভিপি পদে পুনরায় জয় লাভ করে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের অগ্রভাগে সক্রিয় থেকে নিজে মেলে ধরেন রাজনৈতিক নতুন অবয়বে। এরপর ১৯৯১ সালে জেলা ছাত্রদলের কমিটিতে সহ-সাধারন সম্পাদক পদ লাভ করে ১৯৯৩ সালে তরুণ বয়সেই ব্যাপক জনপ্রিয়তায় তৎকালীন ময়মনসিংহ পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের কমিশনার নির্বাচিত হয়ে সুনামের সাথে দ্বায়িত্ব পালন করেন পৌরসভার প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে। ১৯৯৭ সালে জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটিতে তিনি সদস্য পদ লাভ করে ১৯৯৯ সালে দ্বিতীয় বার পৌরসভার কমিশনার নির্বাচিত হন। সেই থেকে দলীয় রাজনীতিতে তাকে আর পিছু তাকাতে হয়নি। পরবর্তীতে তিনি কোতয়ালী বিএনপির সভাপতি এবং দক্ষিণ জেলা বিএনপির সহ-সভাপদি পদে দ্বায়িত্ব পালনকালে বিএনপির মনোনয়নে সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়ে একজন নন্দিত জননেতা হিসেবে নিজেকে আর্বিভূত করেন।

    তীক্ষè মেধাসম্পন্ন সজ্জন মানুষ ছিলেন বিএনপি নেতা ওয়ালিদ। দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ ভাববিনিময় করার পারঙ্গমতার কারণে রাজনীতিতে তিনি ছিলেন অগ্রসরমান। তাঁর মেধা ও প্রাজ্ঞতায় ময়মনসিংহের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবীদ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন বেশ সহজেই। মামলা-হামলা উপেক্ষা করে দলের প্রতি তাঁর ত্যাগ এবং সাংগঠনিক দক্ষতা, অনলবর্ষী বক্তা ও ব্যতিক্রমী বাচনভঙ্গিমার কারণে একজন জনপ্রিয় রাজনীতিবীদ হিসেবেও সাধারনের মনে খুব সহজেই ঠাঁয় করে নিয়েছিলেন তিনি। নিয়মিত জনসংযোগ-কর্মী সংযোগ আর বিচক্ষন নেতৃত্বের বহি:প্রকাশ দৃশ্যমান হয়ে ফুটে উঠেছিল বলেই ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের বিগত সরকারের সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তায় ধানের শীষ প্রতিকে তিনি বিপুল ভোটে চেয়ারম্যান পদে জয় লাভ করেন সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে। স্বপ্ন ছিল একদিন জনগনের প্রত্যক্ষ সমর্থনে জাতীয় সংসদ সদস্য পদে বিজয় লাভ করে দেশ ও দলের জন্য কাজ করবেন। কিন্তু তাঁর সে স্বপ্ন ফুল হয়ে ফুটার আগেই ২০১৯ সালের ১৮ই জুন ঝড়ে পড়ে অকাল প্রয়ানে।

    ১৯৬৭ সালের ১৫ই আগষ্ট জন্মগ্রহন করে মাত্র ৫২ বছর বয়সে বর্নাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী কামরুল ইসলাম মো: ওয়ালিদ এক মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে আকস্মিক মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রীসহ এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তান রেখে গেছে। বর্তমানে পুত্র খালিদ ইবনে ওয়ালিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এপ্লাইড কেমিষ্ট্রিতে অর্নাস মার্ষ্টাস শেষ করে আমেরিকায় স্কলারশীপে অপেক্ষমান। আর মেয়ে ওয়ালিদ বিনতে অর্পি সদ্য এইচএসসি পাশ করে উচ্চ শিক্ষায় অপেক্ষমান।

    আজ ১৮ই জুন কামরুল ইসলাম মো: ওয়ালিদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর প্রথম মৃত্যু বার্ষিকীতে শ্রদ্ধা। প্রয়াত এ বিএনপি নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই আজ বৃহস্পতিবার (১৮ই জুন) বাদ জোহর ময়মনসিংহ নগরীর বিএনপি কার্যালয়ে দোয়া মাহফিলের আয়োজ করেছে কোতয়ালী বিএনপি।

    এক সময়ের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা কামরুল ইসলাম মো: ওয়ালিদের নানান অমলিন স্মৃতি তুলে ধরে ময়মনসিংহের প্রভাবশালী জাসদ নেতা সৈয়দ শফিকুল ইসলাম মিন্টু বলেন, জাসদ কর্মী হিসেবে কামরুল ইসলাম ওয়ালিদের রাজনৈতিক জীবন শুরু হলেও বিএনপির রাজনীতিতে তাঁর বেড়ে উঠা। সে ছিল আমার ¯েœহভাজন এবং ঘনিষ্টজন। সময়ের পালা বদলে আমার সাথে তাঁর দল-মতের পার্থক্য থাকলেও এলাকার উন্নয়নে সে ছিল সম্প্রীতি বান্ধব নেতা। তাঁর অকাল প্রয়ান দুঃখজনক। দেশ ও সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি।

    ময়মনসিংহ মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক জননেতা আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ স্মৃতিচারণ করে বলেন, স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সহযোদ্ধা ওয়ালিদ ছিলেন রাজপথের অগ্রভাগের নেতা। জনপ্রতিনিধি হিসেবেও তিনি ছিলেন একজন বলিষ্ট নেতৃত্ব। তাঁর জীবদ্দশায় নীতি ও কর্ম দিয়ে বিএনপিকে গতিশীল এবং সমৃদ্ধ করে গেছেন। তাঁর এ হঠাৎ প্রস্থান দল এবং সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি। মহান আল্লাহ তাকে বেহেস্ত নসিব করুন।

    স্মৃতি কথায়-লেখক সাংবাদিক : মো: আমান উল্লাহ আকন্দ
    জাহাঙ্গীর
    জেলা প্রতিনিধি- দৈনিক দিনকাল ও দৈনিক মানবকন্ঠ:

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *